কঠোর সঞ্চিত যাঁর তীব্র তপাবলি
পরাজিত সিদ্ধযোগী মুনীন্দ্র সকল।
মঙ্গল বিধানে সর্ব-জীবের নিস্তার,-
পাপীদের পরিত্রাণ সদা চিন্তা যাঁর।
অপার মহিমা গুণ করিলে শ্রবণ,
জীবের যাতনারাশি করে পলায়ন।
এমন পবিত্র যাঁর মহিমা অপার
মহাযোগীশ্বর তাঁকে করি নমস্কার॥
ওঁ নমো ভগবতে লোকনাথায়
মহাযোগী ভগবান শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারীর পবিত্র জীবনকথা ও মহিমাময় পাঁচালি-পাঠ
“যে নাম স্মরিলে সর্ব জীবের নিস্তার ॥”
পাঁচালী-পাঠের আরম্ভ — ভক্তগণের আহ্বান ও মঙ্গল কামনা
এসো এসো পাপী তাপী আর ভক্তগণ ॥
লোকনাথ বাবার কথা করহ শ্রবণ ॥
মহাযোগী লোকনাথ নামটি তাঁহার ॥
যে নাম স্মরিলে সর্ব জীবের নিস্তার ॥
আশুতোষ সম তিনি অতি দয়াবান ॥
স্মরণেতে পরাগতি করেন প্রদান ॥
ডাকিলে তাঁহারে সর্বপাপ দূরে যায় ॥
অজ্ঞতা নাহি থাকে তাঁহার কৃপায় ॥
মায়াবদ্ধ হয়ে জীব রহেছে সংসারে ॥
কিসে পাবে মুক্তি তারা খোঁজে বারে বারে ॥
মহাযোগী লোকনাথ কর্মফল দাতা ॥
জীবের কল্যাণকামী শুভফল জ্ঞাতা ॥
এ সংসার কারাগার করিতে নিস্তার ॥
পরম দয়াল বাবা নেন অবতার ॥
সবে এসো করি তাঁর পথ স্মরণ ॥
সফল হউক ভাই মানব জীবন ॥
পশ্চিমবঙ্গের কচুয়া গ্রামে মহাপুরুষের জন্মলীলা
জেলা উঃ ২৪ পরগনা পশ্চিম বঙ্গে ।
কচুয়া নামে গ্রাম নিকটবর্ত্তী বারাসতে ॥
শ্রীরামকানাই ঘয়াল নামেতে ।
শান্তিতে করেন বাস গ্রাম কচুয়াতে ॥
শ্রীকমলা দেবী হন তাঁহার গৃহিণী ।
দেব-দ্বিজে ভক্তি সদা সতী সীমন্তিনী ॥
রামকানাই পত্নীরে ডাকিয়া বলেন ।
এক পুত্র তুমি মোরে করিবে অর্পণ ॥
সেই পুত্র গৃহ ছাড়ি সন্ন্যাসী হইবে ।
তার ফলে বংশ মোর উদ্ধার পাইবে ॥
অতঃপর তিন পুত্র তাহার জন্মিল ।
কিন্তু পুত্রে দিতে মাতা রাজী না হইল ॥
ভূমিষ্ঠ হইল যবে চতুর্থ সন্তান ।
সন্ন্যাসীর তরে তারে করিলেন প্রদান ॥
অপূর্ব সুন্দর শিশু দেখিয়া নয়নে ।
মাতা পিতা আনন্দিত হইলেন মনে ॥
নহেক সামান্য শিশু বলে সকলেতে ।
নানরূপ সুলক্ষণ রয়েছে অঙ্গেতে ॥
কচুয়ার পার্শ্ববর্ত্তী গ্রাম কাঁকড়াটে ।
ভগবান গাঙ্গুলী থাকেন নিজ ভবনেতে ॥
শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত তিনি অতি নিষ্ঠবান ।
ব্রহ্মতেজে তেজী তিনি অতি নিষ্ঠবান ॥
রামকানাই সাথে পরিচয় ছিল ।
সংবাদ পাইয়া তিনি দেখিতে আসিল ॥
সর্ব সুলক্ষণযুক্ত দেখিয়া শিশুরে ।
অতিশয় আনন্দিত হলেন অন্তরে ॥
ভগবান পাঁজি দেখি নির্দ্ধারণ করিল ।
নামকরণ, উপনয়ন ও গুরুপাদে গৃহত্যাগ
লোকনাথ নাম তাঁর তিনিই রাখিল ॥
রামকানাই মনে যাহা ভেবেছিল ॥
ভগবান গাঙ্গুলীরেরে সকল কহিল ॥
অতঃপর বলিলেন রামকানাই ॥
আমার পুত্রের ভার করুন গ্রহণ ॥
বলিলেন ভগবান উত্তম এ কথা ॥
এক সত্য মনে তুমি রাখিও সর্বদা ॥
উপনয়নের কার্য যাবে শেষ হবে ॥
পুত্র তব গৃহ ছাড়ি মোর সঙ্গে যাবে ॥
রামকানাই তাহে সম্মত হলেন ॥
ভগবান হলেন আনন্দিত মন ॥
ক্রমে ক্রমে বাড়ে শিশু যেন শশধর ॥
পিতা মাতা দেখি তারে আনন্দ অন্তর ॥
প্রতিবেশী পুত্র বেণীমাধব নামেতে ॥
তার সনে লোকনাথ খেলে আনন্দেতে ॥
অত্যন্ত চঞ্চল এই বালক দু'জন ॥
প্রতিবেশীগণ সদা করে জ্বালাতন ॥
এগারো বছর যবে লোকনাথ হইল ॥
পিতা তার উপনয়নের ব্যবস্থা করিল ॥
বেণীমাধব লোকনাথ এক শুভদিনে ॥
উপনীত হলেন শাস্ত্রের বিধানে ॥
ভগবান গাঙ্গুলী তাহে আচার্য হইল ॥
একত্রে উভয়ের উপনয়ন দিল ॥
আত্মীয়-স্বজন এলো আমন্ত্রিত সব ॥
পাড়া প্রতিবেশী আসে মহা কলরব ॥
জ্যৈষ্ঠময় দেহধারী ভগবান গাঙ্গুলী ॥
উপনীত দু'জনার কাঁধে দেন তুলি ॥
গাঙ্গুলী বলেন ওহে রামকানাই।
তব পুত্র লয়ে আমি করিব গমন।।
পূর্ব প্রতিশ্রুতি মত হয়েছে সময়।
লয়ে যাব তব পুত্রে দাও হে বিদায়।।
রামকানাই শুনি আনন্দিত চিতে।
তলে দিল পুত্র তার গাঙ্গুলীর হাতে।।
বেণীমাধব বলে আমি যাইব সঙ্গেতে।।
যেথা লয়ে যাবে গুরু যাব সেথানেতে।।
ভগবান গাঙ্গুলী হয়ে আনন্দিত মন।।
ব্রহ্মচারীদ্বয় লয়ে করেন গমন।।
মুণ্ডিত মস্তক আর দণ্ড লয়ে হাতে।।
বেণীমাধব লোকনাথ বাহিরিল পথে।।
তিনজনে পথ বাহি যান ধীরে ধীরে।।
পডিবেশীগণ সবে তাপে অশ্রুনীরে।।
কালীঘাটে কুটির-সাধনা ও ক্রমাগত কঠোর ব্রতের অনুশীলন
ক্রমে ক্রমে গ্রাম ছাড়ি তাঁরা তিনজন।
দীর্ঘ পথ হাঁটি তাঁরা করেন গমন।।
শহর নগর গ্রাম পার হয়ে যায়।
নদ-নদী বন কত ছাড়ি অগ্রসর হয়।।
মহাতীর্থ পীঠস্থান কালীঘাটে এসে।
ভগবান গাঙ্গুলী সেথা নামিলেন শেষে।।
ঘন জঙ্গলেতে ভরা ছিল পীঠস্থান।
ঢালা ঘরে ছিল মাতৃমূর্তি অধিষ্ঠান।।
খরস্রোতা আদিগঙ্গা বেগে বয়ে যায়।
চারিদিকে বন সেথা নাহি লোকালয়।।
শক্তি সাধনার দেখি উপযুক্ত স্থান।
গাঙ্গুলী করেন সেথা কুটির নির্মাণ।।
এক বৃক্ষতলে গুরু আসন করিয়া।
বসালেন শিষ্যদ্বয়ে যতন যতনে।।
বিভিন্ন সাধনা গুরু আজ্ঞা পালনে মনে।
কালীঘাটে কিছুদিন সাধনা করিয়া।।
প্রস্থান করেন গুরু শিষ্যদের নিয়া।
গঙ্গা পার হয়ে গুরু শিষ্যদের নিয়া।।
গভীর জঙ্গলে আসে মনোরম স্থানে।
জঙ্গলের মাঝে এক কুটির রচিয়া।।
লতা পাতা দিয়া গুরু শিষ্যদের নিয়া।
অবস্থান করে গুরু শিষ্যদের নিয়া।।
একদিন গুরুদেব শিষ্যদের কন।
এইবার তোমরা নঙব্রত করহ পালন।।
শুনি শিষ্যদ্বয় কহে অবাক হইয়া।
নঙব্রত কিবা গুরু দিন বুঝাইয়া।।
নঙ অর্থে রাত্রি ব্রত দিনে উপবাস।
আহার সংযম হয় করিলে অভ্যাস।।
গুরু হয় নঙব্রত গুরুর আদেশে।
রাত্রিতে আহার দিনে থাকে উপবাসে।।
ভক্তি করি গুরুদেব তিল দুগ্ধ আনে।
সিদ্ধ করি শিষ্যদের খাওয়ান যতনে।।
শিষ্যদ্বয় সদা থাকে সাধনায় রত।
শিষ্যদের সেবা গুরু করেন নিয়ত।।
নঙব্রত একদিন সমাপ্ত হইল।
একান্তরা ব্রত গুরু করিতে বলিল।।
একদিন একরাত্রি পূর্ণ অনশন।
পরদিন একবেলা আহার গ্রহণ।।
একাগ্রতা ব্রত পূর্ণ হইল যখন ॥
করিতে ত্রিরাত্রি পূর্ণ অনশন ॥
তিনদিন তিনরাত্রি আহার গ্রহণ ॥
তারপর একে একে শেষ যেদিন হইল ॥
পঞ্চাঙ্কের ব্রত গুরু করিতে বলিল ॥
পাঁচদিন একেবলা আহার গ্রহণ ॥
পঞ্চাঙ্কের ব্রত শেষ যেদিন হইল ॥
নবরাত্র ব্রত গুরু আদেশ করিল ॥
নয়দিন উপবাসে থাকে শিষ্যদ্বয় ॥
একদিন নবরাত্র ব্রত করি শেষে ॥
দ্বাদশাহ ব্রত করে গুরুর আদেশে ॥
উপবাস করি তাঁরা থাকে বারেদিন ॥
আহার করেন পরে মাত্র একদিন ॥
পঞ্চাঙ্কের ব্রত করে একদিন শেষ ॥
এই ব্রত শেষে মাসাহের ব্রত নেয় ॥
একমাস পরে একদিন মাত্র খায় ॥
এইরূপে ব্রত আর সাধনা করিতে ॥
চল্লিশ বৎসর কাটে দেখিতে দেখিতে ॥
গুরুর বয়স হইল শতেক বৎসর ॥
শিষ্যের বয়ঃক্রম পঞ্চাশ বছর ॥
গুরু বাক্য শিষ্যদ্বয় করেন পালন ॥
গুরুর নির্দেশ মতো করেন সাধন ॥
অতঃপর লোকনাথ গুরুর আদেশে ॥
দ্বিতীয় মাসাহ ব্রত করে অবশেষে ॥
দুইমাস পরে মাত্র একদিন খায় ॥
পূর্বজন্ম স্মৃতি তাহে লোকনাথ পায় ॥
পর্বত-গুহায় গুরুর আদেশে অখণ্ড তপস্যার সূচনা
জাতিশ্বর হন তিনি গুরুর কৃপাতে ॥
শিষ্যদের লয়ে গুরু থাকে আনন্দতে ॥
তারপর গুরুদেব শিষ্যদের লয়ে ।
সাধনার জন্য তিনি আসেন হিমালয়ে ॥
ক্রমে ক্রমে উঠিলেন পর্বতচূড়ায় ॥
শিষ্যদ্বয় দেখিলেন হইয়া বিস্মিত ॥
গাছ-পালা শুধু চারিদিকে বয় ।
হিমের প্রবাহ শুধু চারিদিক বয় ॥
নাহি কল-কোলাহল গম্ভীরতাময় ॥
সেইখানে দেখিলেন গুরু ভগবান ॥
রহিয়াছে সাধনার উপযুক্ত স্থান ॥
মনোরম গুহামধ্যে গুরু প্রবেশিয়া ।
আসন করিয়া দেন যতন করিয়া ॥
সে আসনে শিষ্যদ্বয়ে গুরু বসাইল ।
তারপর তাঁহাদের আদেশ করিল ॥
এখানে তপস্যা কর বসি দু'জনায় ।
যতদিন ব্রহ্মজ্ঞান লাভ নাহি হয় ॥
যাহা কিছু শিখাইয়াছি আমি এতদিন ।
যা কিছু করেছ ব্রত আচরণ প্রতিদিন ॥
যা কিছু সহ সব সাহায্য করিবে ।
তপস্যায় সেই সব সাহায্য করিবে ॥
নিস্তরঙ্গ ব্রহ্মজ্ঞান ইথে লাভ হইবে ॥
ইন্দ্রিয় রহিবে বসে কিছু না থাকিবে ॥
ক্ষুধাতৃষ্ণ তোমাদের কিছু না পাশে ।
ভয় নাই আমি আছি তোমাদের পাশে ॥
জেগে রব তোমাদের সিদ্ধিলাভ আশে ॥
আমার লাগিয়া বৎস নাহি কোনও ভয় ।
সুস্থ দেহে রব আমি কৃপায় ॥
দীর্ঘ তপস্যার পরিণতি — পরম সত্যের সাক্ষাৎ প্রাপ্তি
গুরুকে প্রণাম করি শিষ্য দুইজন।
তপস্যা করিতে তাঁরা বসিল দু'জনে॥
গুরু আর শিষ্যদ্বয় মিলি তিনজন।
একাগ্র মনেতে তাঁরা করেন সাধন॥
দিবা-রাত্রি, শীত-গ্রীষ্ম কিছু নাই মনে।
সমাধি যোগেতে স্থির রহে শিষ্যগণে॥
দিবা-রাত্রি পক্ষ করি কাটে কত মাস।
একে একে কেটে গেল বছর পঞ্চাশ॥
অবশেষে একদিন ইচ্ছা পূর্ণ হইল।
ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করি ধ্যানভঙ্গ হইল॥
চক্ষুমেলি শিষ্যদ্বয় দেখেন চাহিয়া।
সম্মুখতে গুরুদেব আছেন দাঁড়াইয়া॥
গুরুর চরণে শিষ্য প্রণাম করিল।
গুরুদেব শিষ্যদের বুকে তুলে নিল॥
গুরু বলে ওরে শিষ্য কি বলিব আর।
আজও ব্রহ্মজ্ঞান লাভ হয়্নি আমার॥
শুনি তাহা লোকনাথ দুঃখিত হইল।
গুরুর চরণে ধরি কাঁদিতে লাগিল॥
ব্রহ্মজ্ঞান লাভেবারে আদেশ করিয়া।
আপনি রহিলে প্রভু কাঙাল হইয়া॥
গুরু বলে সিদ্ধিলাভ হলো হিমালয়ে।
এইবার চলো মোরা যাই লোকালয়ে॥
মহাযোগীশ্বরের মহিমা-স্তুতি — পনেরোটি প্রার্থনা
কঠোর সঞ্চিত যাঁর তীব্র তপাবলি
পরাজিত সিদ্ধযোগী মুনীন্দ্র সকল।
মঙ্গল বিধানে সর্ব-জীবের নিস্তার,-
পাপীদের পরিত্রাণ সদা চিন্তা যাঁর।
অপার মহিমা গুণ করিলে শ্রবণ,
জীবের যাতনারাশি করে পলায়ন।
এমন পবিত্র যাঁর মহিমা অপার
মহাযোগীশ্বর তাঁকে করি নমস্কার॥
জ্ঞানী ধ্যানী নত কত চরণ কমলে
সূর্যসম দীপ্তি যাঁর নয়ন যুগলে।
মস্তক জটিত চারু পিঙ্গল জটায়,
দিব্যকান্তি উদ্ভাসিত জ্ঞানের আভায়।
লম্বিত যুগল বাহু জানুযুগ পরে,
জগত কলুষ রাশি যাঁর নামে হরে।
পর ব্রহ্মে লীন যাঁর সদা মনঃ প্রাণ।
প্রণমি তাঁহারে যিনি ত্রিগুণ নিদান॥
জনমবধি ব্রহ্মচর্য সত্রবত যাঁর
মদন যেখানে নাহি পায় অধিকার।
জীবে দয়া নিরবধি যাঁর অবতার।
জগতের মঙ্গলার্থ যাঁর আবির্ভাব।
মোহান্ধ বিশ্বে দগ্ধ জীবগণ
ভক্তিভরে যাঁর পদে লইয়া শরণ॥
জর্জরিত জীব তীব্র সংসার জ্বালায়,
মুক্তিহেতু ভক্তি ভাবে নামি তাঁর পায় ॥
হিমাদ্রকন্দরে তব তপস্যার কালে,
আবরিত কলেবর তুহিন সকলে।
শীতের তুহিন রাশি শরীরে জিমিয়া,
গ্রীষ্মের তপন তাপ যাইতে গলিয়া।
শতাধিক বর্ষহেন পুরুষ প্রধান ॥
ব্রহ্মপদ লভিলেন পুরুষ প্রধান ॥
জন্তুগণ ক্রুর করি পরিহার
শান্তভাবে বিহরিত প্রভাতে তোমার।
তব সহ প্রেমমুগ্ধ বিহঙ্গমগণ
নির্বয়ে করিত সবে প্রণয় স্থাপন ॥
এইরূপে নিজে ধর্ম করি অনুষ্ঠান,
করিলেন সর্বজীবে সুশিক্ষা প্রদান।
যষ্ঠাধিক শতবর্ষ লীলা প্রকাশিয়া
চিরশান্তি লভিলেন ব্রহ্মলোকে গিয়া ॥
গুণের অতীত যিনি ত্রিগুণকারন,
কেমনে করিব তাঁর গুণের বর্ণন?
অতীন্দ্রিয় অপ্রেমময় মহিমা যাঁহার
মূঢ় আমি কি করিব ভজনা তাঁহার?
স্পন্দন ছিল না তব নয়ন যুগলে,
বিহরিল শূন্যমার্গে অতি কুতূহলে।
নিয়ত প্রত্যক্ষ তব ব্রহ্মজাপার
জীবের মঙ্গল নিত্য কামনা তোমার।
পদ্মরাগ পরাজিৎ ও পদ শোভায়
অশেষ কল্যাণ দেব মাগি রাধা পায় ॥
মনের অগম্য যিনি সর্ব যোগীশ্বর
তন্ত্রের বিধানে যিনি কুল-চক্রেশ্বর।
স্বগুরুর ত্রাণ হেতু গুরু অবতার
জগতের গুরু তাঁকে ভজি অনিবার ॥
তব দণ্ড গীতাতত্ত্ব কবি সংসার
ধন্য কত অন্তবাসী জ্ঞানের আধার।
লীলাময়ী যার বচন মাধুরী
ভজ সেই লোকনাথে পাপতাপহারী ॥
করুণা তরঙ্গে ভরা হৃদি পারাবার
সর্বজীবে সময় দয়া সতত তোমার।
ভব তাপে দহে নিত্য দেহ প্রাণ মন,
কি দোষে বঞ্চিত পদে এ অধম জন?
তব নাম সংকীর্তনে হয়ে মাতোয়ারা
ভক্তবৃন্দের ঝরে সদা অশ্রুধারা-
অদর্শনে উৎকণ্ঠিত ব্যাকুল হৃদয়,
কৃপা কর, লোকনাথ, দিয়ে পদাশ্রয় ॥
ভবরা জলধি-জলে দিয়েছ সাঁতার
রিপুবশে অপরাধ করি শতবার।
পাপবশে সদা মোর দৈব প্রতিকূল,
রক্ষা কর, লোকনাথ, হয়েছি আকুল ॥
এখনও সূক্ষ্মদেহ করিয়া ধারণ,
বিরিঞ্চ কত ভক্ত সাধুর তথায়,
কত নিত্য নব লীলা প্রকাশ তথায়,
নমস্কার করি, দেব, রেখে রাঙা পায় ॥
জ্ঞানবলে দ্বৈত ভাব করিলে বর্জন,
তোমার নামেতে মুক্ত হয় জীবগণ।
ত্রিলোকের গুরুরুপে প্রকাশ ধরায়
প্রণমি, হে লোকনাথ, তোমার রাঙা পায় ॥
ভক্তির আবেগে রচিত প্রার্থনা-গান
তোমার করুণা, তোমারি স্নেহ
সুখে দুঃখে সদা পালিতে আমায়।
তবু শ্রান্ত কেন অশান্ত পরাণ
নিরাশ পাথারে, ভাসিয়া বেড়ায় ॥
পথ ভুলে যাই, কণ্টক কাননে,
পথিকবেশ পথে রাখ টেনে।
বিভীষিকা-হলে, নিবারি গমনে
তোমারি করুণা জীবন বাঁচায় ॥
ভয় পাই যদি সংসার-অনলে,
ভাবি, বুঝি দূরে-গেছে চলে।
ক্ষণেক পরে দেখি, আবারি অন্তরে
লুকায়ে রেখেছ চরণ-ছায়ায় ॥
অতীন্দ্রিয় তুমি, তব সূক্ষ্ম গতি,
কি বুঝিব তব মহিমা-বিভূতি।
অনন্ত আধারে, অনন্ত মূরতি
অনন্ত স্বরূপে প্রকাশ ধরায় ॥
বারিপূর্ণ ঘটস্থাপনা ও বাবার বাহ্যিক আরাধনার কীর্তন
পটমাসে বাবা লোকনাথ হও অধিষ্ঠান। (বাবা)
তোমারি অর্চনা করি, চাহে যে পরাণ ॥ (বাবা)
বারিপুর্ণ ঘট করিলাম স্থাপন।
তোমারি বন্দনা গানে করি আবাহন ॥ (বাবা)
গঙ্গা বারি আনিয়াছি এ স্থান ॥ (বাবা)
দয়াল মহাপ্রভু আসিয়া এ স্থান ॥ (বাবা)
ধূপদীপ জ্বালিয়াছি নৈবেদ্য সাজিয়া।
করহ গ্রহণ বাবা হেথায় আসিয়া ॥
দূরে তো রহ না তুমি, আছ মোর পাশে।
অনুভবে বুঝি বাবা ডাকিছে সন্তানে ॥ (বাবা)
ঘট মাঝে বস বাবা শূন এ'পরাণ ॥
তোমারি বিহনে বাবা শূন এ'পরাণ ॥
পত্র-পুষ্প নাহি বুঝে নাহি জানি আচার ॥ (বাবা)
অধম সন্তান আমি করি উচ্চারণ।
তোমার নামের মন্ত্র করি আবাহন ॥ (বাবা)
জয় বাবা লোকনাথ করি আবাহন ॥ (বাবা)
জয় বাবা দয়ে বাবা সাজালে তোমায়।
গীতি মাল্য দিয়ে বাবা সাজালে তোমায় ॥ (বাবা)
ক্ষমা করো জগৎবন্ধু-নামি তব পায় ॥ (বাবা)
হৃদয়-কমলে বাবার আসন দেওয়ার কীর্তন
ও হরি ওঁ হরি। ওঁ তৎসৎ।
তোমার চরণে বাবা করি দণ্ডবৎ ॥
হৃদয়ের মাঝে বস হৃদয়ের ধন।
অন্তর মন্দির বাবা করি আবাহন ॥
বসিতে আসন দিলাম হৃদয় কমলে।
চরণ ধোয়াব বাবা প্রেম অশ্রুজলে ॥
মন তুলসী ভক্তি চন্দন দিব তোমার পায়।
পঞ্চ প্রেমের ভোগ সাজি নিবেদি তোমায় ॥ (বাবা)
অন্তর অন্তস্থলে পাতিলাম আসন।
চিরস্থিতি লহ বাবা এই নিবেদন ॥
নয়ন মুদিলে যেন দেখিবারে পাই।
শুধু এই ভিক্ষা মাগি বারংবার গোঁসাই ॥ (বাবা)
জয় জয় লোকনাথ — মহাকীর্তনের আনন্দধ্বনি
জয় জয় আত্মারাম জয় লোকনাথ। জয় জয় যোগেশ্বর জয় লোকনাথ ॥
জয় জয় প্রাণারাম জয় লোকনাথ ॥ জয় জয় লোকেশ্বর জয় লোকনাথ ॥
জয় জয় শিবরাম জয় লোকনাথ। জয় জয় তীর্থনাথ জয় লোকনাথ ॥
জয় জয় ব্রহ্ম লোকনাথ। জয় জয় দীননাথ জয় লোকনাথ ॥
জয় জয় চন্দ্রনাথ জয় লোকনাথ ॥
জয় বাবা লোকনাথ, জয় মা লোকনাথ,
জয় গুরু লোকনাথ, জয় ব্রহ্ম লোকনাথ,
জয় শিব লোকনাথ।
ভক্তির আরও দুইটি পবিত্র স্থানে আমন্ত্রণ